যুদ্ধদিনের আলাপ
বাতাসে বারুদের গন্ধ ভেসে এলে অতঃপর মুখ লুকায় পাশের বাড়ির জীবন্ত ছায়াগুলো। অথবা আমাদের চোখের সামনেই দেখি অলসদিনের গান শোনার ফাঁকে চলে আসে মর্টার শেলের টুকরা–টাকরা। তখন শিশুদের ঘুম ওড়ে যায়, তখন যুবক–যুবতীর গড়ে তোলা স্বপ্ন–বাগান অসহায় আর্তনাদ করতে–করতে ভেঙে পড়ে, তখন বৃদ্ধ–বৃদ্ধার নিরাপদ আশ্রয় টলোমলো করে। আকাশ জুড়ে কালো ধোঁয়ার ওড়াওড়ির কালে পাখিদের কোলাহল থেমে গেলে ট্যাংক বোঝাই জাহাজের চলাচল বেড়ে যায়। এপ্রান্তে–ওপ্রান্তে শেয়ারবাজারের সূচক ঊর্দ্ধগামী হলে সঞ্চয়ী হিসাবে টান পড়ে। তখন শস্য ফলানোর কাল ছিল। কিন্তু শস্যের বদলে গোলা উৎপাদনে বিনোয়োগ বাড়ে। চাষীদের মাথায় হাত পড়ে ডিজেল ও সারের দাম বেড়ে গেলে। টেলিভিশনের স্ক্রিনে দেখা যায় গতকালও যে মাঠে বিভিন্ন প্রাণি চড়ে বেড়াতো আজ তা গর্তে পরিণত। নগরের ধ্বংসস্তূপ থেকে করুণ গন্ধ ভেসে এলে আকাশভেদী শব্দের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ পরামর্শের খবর।
শিশুর কান্নার তলে লুকানো বাণিজ্যদেবীর মিটিমিটি হাসি উপচে পড়ে কখনো কখনো। এ হাসি ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ার মরুভূমি ও আফ্রিকার গহীন জঙ্গলে। এ সুযোগে পারমাণবিক শক্তি বাড়ানোর উৎসাহ বাড়ে দিনেদিনে। ব্যালাস্টিক ও অ্যান্টিব্যালাস্টিক ক্ষেপনাস্ত্রেও শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ড্রোনের চলাচল। আর খাদ্য ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হলে শিশু, বৃদ্ধ আর রোগীদেও আর্তনাদ ওঠে। তবে এ আর্তনাদ হারিয়ে যায় গোলা নির্মাণের কারখানার পেছনে লুকিয়ে থাকা মুদ্রা নামক আরেক ভয়ানক অস্ত্রের ঝনঝনানিতে।
ঘর হারানো কিছু মানুষ সমুদ্রে ভাসতে থাকলে মানবিক সম্পর্কের ব্যাপারে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। এদের কে আশ্রয় দেবে কে? খাবার দেবে কে? তখন সামনে আসে আগুনে খাবার গোদামে পোড়ার জ্বলজ্বলে দৃশ্য। শস্যগুলো ছাই হয়ে গেলে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার অভুক্ত থাকার স্মৃতি জমা হতে থাকে। হয়তো বহুকাল পরে ইতিহাস লেখার সময়ে এগুলো আবার জীবন্ত হয়ে ওঠবে। তার আগে আরও বহুবাড়ি ধ্বংস হবে, বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এদিক–ওদিক ছড়িয়ে পড়বে। সমুদ্রে ভেসে ভেসে মহাদেশ পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করবে যৌথভাবে। আর এসবের আড়ালে নির্মিত হবে ট্যাংক, পারমাণবিক বোমা, রকেট লঞ্চার, যুদ্ধবিমান, দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র…
শান্তির জন্য স্থাপিত সংস্থার নতজানুভাব আকাশে পায়রার বদলে শিশুর কান্না ওড়ায়। তখন বাজারের দোকানগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠলে আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্য জাহাজে মুদ্রা ঘোরাফেরা করে। কেননা তখন মানুষের ঘরে লুকানো শেষ মুদ্রাটিও গোলার আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়। এ সুযোগে খাদ্য সহায়তা, ঋণ সহায়তা নামক বিভিন্ন প্রকল্পের আড়ালে চলে নানা মাত্রার নিয়ন্ত্রণ। তখন নিজের ভূমিতেই অচেনা লাগে নিজেকে। যুদ্ধনীতির সাথে সমান্তরালে চলমান অর্থনীতির তাবৎ ক্রীয়া কোনো কোনো ঘরে কান্নার আলোড়ন তোলে আর কোনো কোনো মহানগরীর সুরম্য প্রাসাদের ভেতর তৈরি করে অশ্রুহাসির নিরবচ্ছিন্ন স্রোত।




Total Users : 8920